বৃহস্পতিবার, ১ মার্চ, ২০১২

বাসর রাতেই বিলাই মারিতে চান?? (অবিবাহিত পুরুষদের জন্য)


অতি ছোটবেলা থেকেই দেখিতেছি--পুরুষ যত শক্তিমানই হউক না কেন, বিবাহের পর পরই কেমন যেন পুতাইয়া যায়! সেই পুতানোর ধরন এমনই যে, যেই পুরুষ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠিয়াই নিয়মিত ব্যায়াম করিয়া শরীরের বাইসেপ- ট্রাইসেপ বাড়াইতো--আজ সেই তার বউয়ের হাত-পায়ের বাইসেপ টিপিয়া আদরে ঘুম পাড়াইয়া দেয়!! বাবা মায়ের এত কষ্টের তৈরী সুউচ্চ মেরুদন্ডের পিলার, বাসর রাতের পর থেকেই কেমন নড়বড় করিতে থাকে!!


যাহাদের মেরুদন্ডের পিলার এহেন নড়বড়ে, তার একটাই কারণ। উনারা বাসর রাতেই বিলাই মারিতে ব্যর্থ হয়েছেন! আর যারা প্রথম পনের মিনিট কাম-ক্রোধ আটকাইয়া শক্ত হাতে বিলাই মারিতে পারে, তারাই ভবিষ্যতে নিজেদের মেরুদন্ডের পিলারে সিমেন্ট লাগাইতে সমর্থ হয়।



সুতরাং, বাসর রাত শুনিয়াই শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর জায়গা না চু্লকাইয়া-- আসেন দেখি কিভাবে সহজেই বিলাই মারা যায়!



পদ্ধতি ১. দুরুদুর বুকে নতুন বউ যখন আপনার পায়ে ধরে সালাম করিতে আসিবে ..... তখনি পিছাইয়া যান! গম্ভীর কন্ঠে বলেন -->''আমার পা অতি পাক। উহা স্পর্শ করিতে হইলে
তোমাকে সাবান দিয়া হাত ধুইয়া আসিতে হইবে!!" নতুন বউ আর কি বলিবে?! হাত ধুইয়া আসিয়া যখন আবার আপনার পা ধরিয়া সালাম করিবে, ততক্ষণে আপনার বিলাই মারা শেষ!



পদ্ধতি ২. নতুন বুউয়ের খোমা দেখে-- 'পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে গিয়ে দেখেছিনু তোমায়'-- টাইপ ডায়লগ দিলেন- তো গেলেন! বরঞ্চ সন্দেহজনক ভাবে তাকাইয়া থাকেন। আর রহস্যময় গলায় কন --''তুমার চেহারা কেন জানি খুবই পরিচিত লাগতাছে! মনে হয় রমনায় অন্য কোন পুলার সাথে  দেখছিলাম!!" বউ যতই আত্মপক্ষ সমর্থন করুক না কেন, আপনি খালি অবিশ্বাসের হাসি হাসতে থাকেন। এহেন সন্দেহের ফলে বিলাই যে পুরাই চিকায় পরিণত হইবে- সেই ব্যাপারে নিচ্চিত থাকতে পারেন!!



পদ্ধতি ৩. বাসর ঘরে বিছানায় উঠেই অনেকে আবেগে কাইত হয়া যায়! আপনি তা না করে বরং খাটের চিপা চাপা থেকে একটা ছারপোকা খুঁজে বার করেন। এরপর হিংস্র ভাবে উহা
টিপিয়া মারিয়া বউয়ের দিকে তাকাইয়া ঠান্ডা গলায় বলেন --> "আমার নিরব শত্রুদের আমি এইভাবেই পিষে মারি!" এভাবে দেখবেন, বিলাই নিরবেই মারা পড়িবে।



পদ্ধতি ৪. বউয়ের নাক-কান দেখিয়া মুগ্ধ হইলেন তো বিল্লী মারার খেলায় ডাক মারিলেন! বরঞ্চ, খুঁত বাইর করেন। আর বলদ বলদ গলায় বলিতে পারেন -- >"আহা.... তোমার নাক দেখি অতিশয় লম্বা! সমস্যা নাই, আমার হাতের একাধিক রাম থাবড় খাইলেই নাক স্ব স্থানে বসে যাইবে।" -- এহেন ডায়লগের পর বিল্লি আপনাতেই আত্মহত্যা করিবে বলিয়া আশা করা যায়!





পদ্ধতি ৫. আপনার কাম- ক্রোধ উত্তেজনা যদি অতি বেশী হয়- অর্থাৎ বিলাই মারার জন্য পনের মিনিটের ধৈর্য্যও যদি না থাকে ........ তাহলে আরেকটা পদ্ধতি অবলম্বন করে দেখতে
পারেন। বাসর ঘরে ঢুকেই ফরাৎ করে পাঞ্জাবী ছিড়িয়া এবং কুইক পাজামা খুলিয়া বিছানায় ঝাপাইয়া পড়িয়া বউয়ের হাত ধরিয়া বলেন --"ভালোবাসা দিবি কিনা বল!?!" এহেন আকস্মিক ঘটনায় ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া বিলাই মরে যেতে পারে!



জানিনা এহেন টিপসে আপনার কাজ হইবে কি না! কারণ, আমি যে অবিবাহিত!! তবুও রিস্ক লইয়া ট্রাই লইবেন , প্রত্যাশা রইলো!!



পরিশেষে.... মেরুদন্ড সোজা করিয়া দাড়াইতে পারেন না যেসব ভাইজান; তাহাদের জন্য দু 'লাইন--


"বউ পিছ পিছ ঘুরিছে দেখ অভাগা পুরুষ জাতি
বাসর রাতেই বিলাই মারিলে কি ছিলো এমন ক্ষতি!!"

সূত্র: ইন্টরনেট ।

বৃহস্পতিবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

হার্ডডিস্কের যেকোনো ড্রাইভ লুকিয়ে রাখুন


হার্ডডিস্কের যেকোনো ড্রাইভ লুকিয়ে রাখুন


আপনার কম্পিউটারে ব্যক্তিগত অনেক তথ্য থাকতেই পারে, যেসব আপনি অন্যদের দেখাতে চান না।সে ক্ষেত্রে চাইলে হার্ডডিস্কের যেকোনো ড্রাইভ লুকিয়ে রাখতে পারেন।উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে চলা কম্পিউটারে এটি খুব সহজেই করা যায়। এ জন্য প্রথমে স্টার্ট মেনু থেকে Run-এ যেতে হবে। এর পর সেখানে cmd লিখে এন্টার করুন।কমান্ড প্রম্পট চালু হবে। কমান্ড প্রম্পট চালু হলে ইউজার নেমের পাশে সবশেষে diskpart লিখে এন্টার করুন।
উইন্ডোজ সেভেনের ক্ষেত্রে একটি নোটিফিকেশন আসবে। সেটাতে ইয়েস করে দিলেই নতুন একটি কমান্ড প্রম্পট (নতুন উইন্ডো) চালু হবে। সেখানে DISKPART> এর পরে লিখুন list volume এবং এন্টার করুন।সব কটি ড্রাইভের একটি তালিকা আসবে। এখন যে ড্রাইভটি আপনি লুকাতে চান (হাইড) চান, সেটির ভলিউম নম্বর লিখুন। লক্ষ করলে দেখতে পাবেন, প্রতিটি ড্রাইভের পাশেই এর ভলিউম নম্বর লেখা আছে। যেমন—আপনি যদি D:\ ড্রাইভ হাইড করতে চান, তাহলে D:\ ড্রাইভের ভলিউম নম্বর লিখে এন্টার করুন।D:\ ড্রাইভের ভলিউম নম্বর ৪ হলে লিখুন DISKPART>-এর পরে লিখুন select volume 4, তাহলে আপনার D:\ ভলিউমটি নির্বাচন করা হবে। তারপর লুকানোর জন্য DISKPART>-এর পরে লিখুন remove letter D, তাহলে আপনার নির্বাচন করা ড্রাইভটি লুকিয়ে পড়বে।যদি ড্রাইভটি আবার দেখতে চান, তাহলে লুকানো ড্রাইভটি একই পদ্ধতিতে নির্বাচন করে লিখুন assign letter D এবং Command Prompt বন্ধ করে দিন। এবারে মাই কম্পিউটারে গেলে ড্রাইভটি আবার দেখতে পাবেন। —ফয়সাল হাসান


সূত্র: দৈনিক প্রথম-আলো, কম্পিউটার প্রতিদিন (হেল্পলাইন) ।

তারিখ: ১৬-০১-২০১২

মুদ্রাস্ফীতি বনাম মূল্যস্ফীতি


মুদ্রাস্ফীতি বনাম মূল্যস্ফীতি


দেশের সার্বিক অর্থনীতি বিষয়ে সাধারণ শিক্ষিত মানুষ, অর্থনীতিবিদ, ভোক্তাসাধারণ—সবার আলোচনায় যে কথাগুলো ঘুরেফিরে আসে, তা হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বা মূল্যস্ফীতি ইত্যাদি। এই দুটি ধারণার সাধারণীকৃত ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে সামান্য বিভ্রান্তি। আমরা যখন মুদ্রাস্ফীতি কথাটা ব্যবহার করি, তার সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ধারণাকে এক করে ফেলি। অবশ্য এই বিভ্রান্তির কারণও আছে। মুদ্রাস্ফীতি বলতে অর্থনীতিতে মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধিকেই বোঝানো হয়। অর্থনীতিতে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে গেলে এবং পণ্য ও সেবার সরবরাহ অপরিবর্তিত থাকলে মূল্যস্ফীতি ঘটে। কারণ অনেক বেশি টাকা সীমিত পণ্য ও সেবার পেছনে ধাওয়া করে। এতে চাহিদা ও মূল্যস্তর—দুটিই বেড়ে যায়। শাস্ত্রীয় ও আভিধানিক অর্থেও মুদ্রাস্ফীতির অর্থ সব ধরনের পণ্য ও সেবামূল্যের ক্রমাগত বৃদ্ধি, যা সাধারণত ঘটে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহের কারণে, যাতে অর্থের মূল্য হ্রাস পায়। বলা হয়, ‘মুদ্রাস্ফীতিতে সবকিছু মহার্ঘ হয়ে যায় কেবলমাত্র অর্থের মূল্য ছাড়া।’ সাধারণ অর্থে মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে মূল্যস্ফীতির এটিই সহজবোধ্য সম্পর্ক এবং মুদ্রাস্ফীতির স্বাভাবিক ধর্মটিও এ রকম। কিন্তু একে সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা যায় না।
প্রকৃতপক্ষে মূল্যস্তর কমলেও মুদ্রাস্ফীতি বিরাজ করতে পারে; আবার মুদ্রাস্ফীতি না থাকলেও মূল্যস্তর বাড়তে পারে। এককথায়, মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে অর্থনীতিতে এর একটা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং এর প্রবণতা কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করে একাধিক নিয়ামকের ওপর। যেমন, বর্তমান যুগে প্রযুক্তির উৎ কর্ষের সঙ্গে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সামগ্রী কিংবা মোবাইল ফোন সেটের দাম কমে আসছে এবং সেটা ঘটতে পারে মুদ্রাস্ফীতি বিরাজমান অর্থনীতিতেও। আবার একটা মন্দাক্রান্ত অর্থনীতিতে কোনো বিশেষ পণ্য বা সেবার মূল্য বাড়তে পারে, যদি এর চাহিদা কারণবশত হঠাৎ বেড়ে যায়। যেমন আমাদের দেশে মুদ্রাস্ফীতির বিপরীত অবস্থা অর্থাৎ মন্দাভাবও যদি বিরাজ করে, তবু ভূসম্পত্তি কিংবা অ্যাপার্টমেন্টের মূল্যস্ফীতি থেমে থাকবে না। কারণ, এর রয়েছে বিশাল চাহিদা, সীমিত সরবরাহ এবং অর্থায়ন প্রাপ্তির সুবিধা।
মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে আরেকটি বিষয় গুলিয়ে ফেলা হয়। সেটা হচ্ছে ভোক্তা মূল্যসূচক। এটি মূলত মূল্যহার পরিবর্তনের হিসাব, যা দিয়ে মুদ্রাস্ফীতি পরিমাপ করা হয়। এই হিসাবের জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট বছরকে ভিত্তি বছর হিসেবে ধরা হয়। তারপর সেই ভিত্তি বছরকে বিবেচনায় রেখে একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের মূল্যস্তর পর্যবেক্ষণ করে রেকর্ড রাখা হয়। ধরা যাক, মুদ্রাস্ফীতির হার নির্ণয়ের জন্য কেবল একটি পণ্যের মূল্যের ওপর ভোক্তা মূল্যসূচক নির্ধারণ করা হয়। এবং ভিত্তি বছর ২০০০ সালে সেই পণ্যটির দাম ছিল এক টাকা এবং এর মূল্যসূচক ১০০। পরের বছর (২০০১) সেই পণ্যটির দাম যদি বেড়ে দাঁড়ায় এক টাকা ২০ পয়সায়, তাহলে মূল্যসূচক হবে ১২০। এখন আমরা ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত যদি মুদ্রাস্ফীতি নির্ণয় করতে চাই এবং ২০১১ সালে সেই পণ্যটির মূল্যসূচক যদি হয় ১৫০, তাহলে এই ১০ বছরে মুদ্রাস্ফীতির হার হবে (১৫০-১২০)—১২০ = ০.২৫, অর্থাৎ শতকরা হিসাবে ২৫ শতাংশ। এ রকম কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ভোক্তা মূল্যসূচক ব্যবহার করে মুদ্রাস্ফীতির হার নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বা একক পণ্যের তুলনামূলক মূল্যবৃদ্ধিকে মুদ্রাস্ফীতি বলা যায় না, যদিও একে সাধারণ মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে এক করে দেখা হয়। কোনো একক পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে সেই পণ্যের বাড়তি চাহিদা কিংবা সরবরাহ ঘাটতির কারণে। অথচ সাধারণ মূল্যস্ফীতি তথা মুদ্রাস্ফীতি চাহিদা সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। এটি নির্ভর করে অর্থনীতির ভাষায় ‘সামগ্রিক চাহিদা’র ওপর। সামগ্রিক চাহিদা বলতে বোঝায়, একটি অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার ওপর সব ভোক্তার মোট ব্যয়, মোট বিনিয়োগ ব্যয়, মোট সরকারি ব্যয় এবং নিট রপ্তানি আয় (আমদানি ব্যয় বাদ দিয়ে)—সবকিছুর সমষ্টি। আর এই সামগ্রিক চাহিদা প্রভাবিত হয় মুদ্রা সরবরাহ দ্বারা। অতএব, মুদ্রাস্ফীতি হচ্ছে একটি মুদ্রানৈতিক বিষয় এবং এর পেছনে কোনো একক পণ্যের সরবরাহ ঘাটতির কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সেই পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধির পরও মূল্যস্ফীতি না ঘটে মুদ্রাস্ফীতি বিরাজ করতে পারে কিংবা উভয়ই ঘটতে পারে। যেমন, কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে ব্যাপক হারে বেড়েছে মুরগি ও ডিমের উৎ পাদন। কিন্তু এতে কি মূল্য কমেছে? নাকি বেড়েছে? সুতরাং, কোনো একক পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি করে মূল্যস্ফীতি কিংবা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সঠিক সংজ্ঞার মুদ্রাস্ফীতিই কেবল সঠিক মুদ্রানীতি দিয়ে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং সেটি যদি হয় চাহিদাজাত মূল্যস্ফীতি। তাহলে মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আরেকটি প্রসঙ্গ স্বাভাবিকভাবেই চলে আসছে। সেটি হচ্ছে দেশের মুদ্রানীতি, যা নিয়ন্ত্রণ করে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুদ্রানীতি হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অর্থনীতির গতি ও প্রবৃদ্ধিকে ঠিক পথে চালানোর জন্য মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যা মূলত করা হয় অর্থ সরবরাহ এবং সুদের হারের মাধ্যমে।
অন্যভাবে বলতে গেলে, মুদ্রানীতি দিয়ে অর্থনীতির মোট চাহিদার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটিয়ে চাহিদাজাত মুদ্রাস্ফীতিকে বাগে আনার চেষ্টা করা যায়। চাহিদা ব্যবস্থাপনার এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মূল্যস্তর ও বিনিয়োগ স্থিতিশীল রাখা। মুদ্রানীতির এই কৌশল প্রয়োগ করা হয় সুদের হার এবং অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সামগ্রিক চাহিদাকে বশে রাখার জন্য। অর্থ সরবরাহ এবং ঋণ নিয়ন্ত্রণ করলে মুদ্রাবাজারে স্বল্প মেয়াদে সুদ বেড়ে যায় এবং ব্যাংকের বাড়তি তহবিল সংগ্রহের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে আমানত এবং ঋণের ওপর সুদ বেড়ে যায়। এতে বিনিয়োগ কমে যায়। আর এ কারণে অর্থনীতিতে হ্রাস পায় সামগ্রিক চাহিদা। হ্রাসকৃত বিনিয়োগের জন্য মানুষের ভোগও কমে যায়, যা আবার প্রভাব ফেলে সামগ্রিক চাহিদার ওপর। এতে দেখা যায়, ঋণ সংকোচন করে বিনিয়োগ, মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমানো যায়, যে প্রক্রিয়ায় একসময় বশে আসে মুদ্রাস্ফীতি।
তবে আজকাল মুদ্রানীতির এই উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা নতুনভাবে আলোকপাত করছেন। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ওয়াই ভি রেড্ডি লেখেন, ‘মুদ্রানীতির উদ্দেশ্য এখন আর মূল্যস্তর স্থিতিশীল রাখায় সীমাবদ্ধ নেই...। এর উদ্দেশ্য এখন আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা পর্যন্ত বিস্তৃত।’
আটলান্টা ফেডারেল রিজার্ভের প্রেসিডেন্ট ডেনিস লকহার্ট বলেন, ‘মুদ্রাস্ফীতি সবকিছুর মূল্য বাড়ায়। এটা কোনো একক পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা কোনো বিশেষ শ্রেণীর পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নয়।’
তাঁর মতে, নির্দিষ্ট বাজারে পণ্যমূল্যকে নিয়মানুগভাবে প্রভাবিত করতে অক্ষম মুদ্রানীতি একটা ভোঁতা অস্ত্র। তাঁর মতে, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওঠানামা এবং কোনো একক পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে অক্ষম। আমরা তেল উৎ পাদন করি না। খাদ্যও ফলাই না। কিংবা দিই না স্বাস্থ্যসেবা। যেসব ঘটনা কোনো কোনো পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং আপনাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণ ঘটায়। যেমন, তেলের অনাগত ধাক্কা কিংবা খরা অথবা ধর্মঘট—এসব আমরা ঠেকাতে পারি না।’
‘
অতএব বাজারধর্মে ঘটা পণ্যের তুলনামূলক মূল্য সংশোধন ঠেকানো মুদ্রানীতির কাজ নয়। এর কাজ হচ্ছে অর্থনীতিতে সব মূল্য পরিবর্তনের সামগ্রিক লক্ষ্য ও গতিকে নিয়ন্ত্রণ করা।’ সে কারণেই আমরা দেখতে পাই, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সুদের হার কিংবা ব্যাংকগুলোর নগদ জমা ও তারল্য হার বাড়ায়, সেটা বাজারের কোনো পণ্যের দাম কমাতে পারে না। তাহলে প্রশ্ন করা যায়, মুদ্রানীতি যদি জীবনযাত্রার ব্যয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে এই নীতির দরকার কী? লকহার্ট এই প্রশ্নের জবাবে বলেন, দরকারটি হচ্ছে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থিরতা আনা, যা সম্ভব আর্থবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার মাধ্যমে।
আমাদের দেশেও যখন ষাণ্মাষিক মুদ্রানীতি ঘোষিত হয়, তখন বিভিন্ন মহল থেকে আশা করা হয়, এটি দিয়ে অর্থনীতির সব সমস্যা, যেমন শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে দ্রব্যমূল্য, বিদেশি বিনিয়োগ থেকে শুরু করে টাকার সঙ্গে ডলারের বিনিময়মূল্য—সবকিছুর সমাধান করে ফেলা যাবে। মুদ্রানীতির কর্মক্ষেত্র যেহেতু চাহিদা ব্যবস্থাপনা, এটি অর্থনীতির সরবরাহ ক্ষমতার ওপর কার্যকর নয়। এটি দিয়ে সামগ্রিক চাহিদাকে প্রভাবিত করে এর হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটানো যায়, আর এটি করা হয় সুদের হারের তারতম্য ঘটিয়ে।
এই সত্য থেকে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় তা হচ্ছে, কেবল চাহিদাজাত মূল্যস্ফীতিকে মুদ্রানীতি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু যে মূল্যস্ফীতি ব্যয়বৃদ্ধিজনিত, সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে মুদ্রানীতি অক্ষম। যেমন আমাদের অর্থনীতিতে খাদ্যমূল্যস্ফীতি কিংবা মুদ্রাস্ফীতি—যা-ই বলা হোক না কেন, ঘটে বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে, কখনোই চাহিদা বৃদ্ধির কারণে নয়, যদিও জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে চাহিদা প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। সুতরাং মুদ্রানীতি দিয়ে চাহিদা ব্যবস্থাপনা করে খাদ্য কিংবা কোনো একক পণ্যমূল্য কমানো সম্ভব নয়। এর আরও একটি কারণ হচ্ছে, খাদ্যের অস্থিতিস্থাপক চাহিদা। অর্থাৎ খাদ্যের দাম যা-ই হোক না কেন, মানুষকে তার মৌলিক চাহিদার প্রধানতমটি, অর্থাৎ খাদ্যচাহিদা মেটাতে হবে। কিন্তু খাদ্য ছাড়া অন্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি কম থাকলেও সার্বিক মূল্যস্ফীতি নির্ভর করে খাদ্যমূল্যের ওপর। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যমূল্যের প্রবণতার ওপর নির্ভর করবে অভ্যন্তরীণ খাদ্যমূল্য এবং তা ঊর্ধ্বমুখী থাকার সম্ভাবনাই বেশি। আমাদের দেশে কিংবা ভারতে বিগত বছরগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি বাগে রাখার জন্য ক্রমাগত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এর কোনো সুফল পাওয়া যায়নি, যা প্রমাণ করে যে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
তাহলে শেষ পর্যন্ত যে কথাটি বোঝা যাচ্ছে, দেশের মুদ্রানীতি যা-ই হোক না কেন, খাদ্যপণ্যের অভ্যন্তরীণ মূল্য নির্ধারিত হবে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও চাহিদার স্থিতিস্থাপকতার ওপর, অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর নয়। অতএব, মূল্যসূচক নির্ধারণের জন্য খাদ্যপণ্য প্রধানতম সামগ্রী হলেও এর মূল্য দিয়ে মুদ্রাস্ফীতি নির্ণয় করলে এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার।




সূত্র: দৈনিক প্রথম-আলো, খোলা কলম ।

তারিখ: ১৫-০৯-২০১১

বাল্যবিবাহ কমেনি


বাল্যবিবাহ কমেনি


সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০০৭-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখনো ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে এবং দুই দশক ধরে এ হার প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। একইভাবে ৬৬ শতাংশের এক-তৃতীয়াংশ ১৯ বছর বয়স হওয়ার আগেই মা বা গর্ভবতী হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বাল্যবিবাহ ছেলে ও মেয়েদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। এতে ঘটে সুন্দর শৈশবের সমাপ্তি; হরণ হয় নিজস্ব পছন্দ ও স্বাধীনতা; অনুপযোগী যৌন সম্পর্কে বাধ্য করা হয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও বিকাশের অধিকার ও সুযোগ খর্ব হয়—সব মিলে মেয়েটির মানসিক ও আবেগগত ক্ষত সৃষ্টি হয়, যা সারা জীবনের সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) গত বছরে প্রকাশিত ‘প্রোগ্রেস ফর চিলড্রেন এচিভিং দি এমডিজিস উইথ ইকুইটি’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়সের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে এবং একই বয়সের পাঁচ শতাংশ ছেলের বিয়ে হচ্ছে। অর্থাৎ, বাল্যবিবাহের কুফল বেশি ভোগ করছে মেয়েরা।
স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দারিদ্র্য, অজ্ঞতা, সচেতনতার অভাব, প্রচলিত প্রথা ও কুসংস্কার, সামাজিক অস্থিরতা, কন্যাশিশুর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব, নিরাপত্তার অভাবকে বাল্যবিবাহের জন্য দায়ী করা হয়েছে। বাল্যবিবাহের দীর্ঘমেয়াদি কুফল ভোগ করতে হচ্ছে নারীদের।
প্রথম আলোয় প্রকাশ, গত বছরের মে মাসে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার শিকটা গ্রামের রোখসানাকে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়ায় সে আত্মহত্যা করে। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় রোখসানাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক দিন পর স্বামীর ঘর ছেড়ে পালিয়ে আসে সে। পরে স্বামীকে তালাক দেয়। এরপর আবার পড়াশোনা শুরু করে। নান্দাইলদীঘি কলেজে পড়া অবস্থায় তার পরিবার আবার দ্বিতীয় বিয়ের জন্য চাপ দেয়। মারা যাওয়ার সময় কলেজের রেকর্ড অনুযায়ী, রোখসানার বয়স ছিল ১৬ বছর ছয় মাস নয় দিন।
জামালপুর জেলার জামিরা গ্রামের কিশোরী শাপলার সম্প্রতি বিয়ে হয়েছে। দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া শাপলার স্বামী বিদেশে থাকেন। পাত্র ভালো, আর্থিক অবস্থাও ভালো। অন্যদিকে শাপলার পিছু নিয়েছিল গ্রামের বখাটেরা। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে উত্ত্যক্ত করত তাকে। চিঠি দেওয়া এবং যে ছেলেরা বিয়ের জন্য যোগ্য নয়, তারাও বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো শুরু করে। কেননা শাপলা দেখতে সুন্দর। শাপলার মা-বাবা মেয়ের বিয়ে দেওয়াকেই নিরাপদ বলে মনে করেছেন বলে প্রথম আলোকে জানান। এই শাপলাকেই বিয়ের পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পরিবারের চাপে হয়তো সন্তান নিতে হবে। অপুষ্ট কিশোরী মা অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেবে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এর পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইনও আছে। ১৯২৯ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন পাস করা হয়েছে। এ আইন ১৯৮৪ সালে সংশোধন করা হয়। আইন অনুযায়ী, বাল্যবিবাহ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ আইনে পুরুষের বিয়ের আইনসম্মত বয়স ন্যূনতম ২১ বছর এবং নারীর ন্যূনতম ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়। এ বিয়ের সঙ্গে জড়িত বর, কনের অভিভাবক, আত্মীয়, ইমামসহ সবার শাস্তির বিধান আছে। জড়িত পুরুষদের এক মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে। তবে কোনো নারীর জরিমানা হলেও জেল হবে না। বর ও কনে দুজনই নাবালক হলে তাদের কোনো শাস্তি হবে না। ছেলে সাবালক ও মেয়ে নাবালক হলে ছেলের এক মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে।
এর পরও বিশ্বের মধ্যে বাল্যবিবাহ বেশি সম্পন্ন হওয়া দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম প্রথম দিকেই রয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের ‘বিশ্বে মায়েদের অবস্থা ২০১০’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ৬৯ শতাংশ নারীর ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০০৭-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীর বিয়ের গড় বয়স ১৫ বছর তিন মাস। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সের নারীদের মধ্যে যাঁদের ১৮ বছরের মধ্যে প্রথম বিয়ে হয়েছে, তাঁদের শতকরা হার ৬৬, যা ২০০৪ সালে ছিল ৬৮ শতাংশ। রাজশাহীতে ৪০, ঢাকায় ৩৩, সিলেটে ২৩, চট্টগ্রামে ২৮, বরিশালে ২৯ এবং খুলনায় ৩৪ শতাংশ নারী ১৫ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে মা হয়েছেন বা প্রথমবার গর্ভবতী হয়েছেন। কিশোরী মাতৃত্বের হার ২০০৪ সাল ও ২০০৭ সালের প্রতিবেদনে ৩৩ শতাংশে আটকে আছে। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৩০ শতাংশ মা এবং ৪১ শতাংশ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে।

বাল্যবিবাহের কুফল: জনসংখ্যার ২৩ শতাংশই হচ্ছে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী। ২০০৮ সালের ‘পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় যোগাযোগ কৌশলপত্র’ অনুযায়ী, কিশোরীদের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ এবং শিশুমৃত্যুর হার জাতীয় গড়ের প্রায় শতকরা ৩০ ভাগের বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে কিশোরীদের অল্প বয়সে বিয়ে জরায়ুমুখের ক্যানসারের অন্যতম কারণ। কেননা, এই মেয়েদের জরায়ুমুখের কোষ পরিপক্ব হওয়ার আগেই স্বামীর সঙ্গে যৌনমিলন করতে হয়। এতে কোষগুলোতে বিভিন্ন ইনফেকশন হয়ে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
এনজিও এনজেন্ডারহেলথ বাংলাদেশের ‘প্রসবজনিত ফিস্টুলা এক করুণ অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে মালেকা, আনোয়ারা, সেলিনাসহ কয়েকজন নারীর বীভৎস জীবনের কাহিনি প্রকাশ করা হয়েছে। এই নারীদের প্রায় সবাই বাল্যবিবাহ ও একাধিক সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে শুধু ফিস্টুলার কারণে অভিশপ্ত জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন।
সন্তান জন্ম দেওয়া, লালন-পালন, পরিবারের দেখাশোনা—এ বিষয়গুলো কিশোরীবধূ ভালোভাবে করতে পারে না। এ জন্য দেখা দেয় নানা জটিলতা।
জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) যোগাযোগ ব্যবস্থাপক আরিফা এস শারমিন প্রথম আলোকে বলেন, ১২ বা ১৩ বছরের একটি মেয়েকে ২৭ বা আরও বেশি বয়সের একজন পুরুষ বিয়ে করছেন। স্বামীর কাছে তাঁর বউ একজন শিশু। একইভাবে শ্বশুরবাড়ির লোকজনও ভাবেন, একে তো শাসন করাই যায়। এতে নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে। আর যে কিশোরী-বউ মার খাচ্ছে, তার কথা বলার অধিকার নেই। সে ভাবে, এটাই হয়তো নিয়ম। আর এ ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সেভাবে সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে ওঠেনি।
আরিফা এস শারমিন জানালেন, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে ইউনিসেফ ২০০৬ সাল থেকে কিশোরী অভিযান নামের একটি কর্মসূচি পরিচালনা করছে। বর্তমানে দেশের ৫৯টি জেলায় কর্মসূচিটি চলছে। এ পর্যন্ত এক লাখ ৩৪ হাজার কিশোর-কিশোরী এ কর্মসূচি থেকে বাল্যবিবাহের কুফলসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ‘পরিবার পরিকল্পনা এবং মা ও শিশুস্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যকণিকা’য় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিশোরীদের মধ্যে প্রজননের হার প্রতি হাজারে ১২৬ জন। এ বয়সের বিবাহিত কিশোরীদের মধ্যেই অপূর্ণ চাহিদার হার বেশি।
আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এস কে রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘দরিদ্র পরিবারে কন্যাসন্তানকে বাড়তি বোঝা হিসেবে মনে করা হয়। তাদের ধারণা, মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিলে অন্ততপক্ষে একজনের খাবার কম লাগবে। বেশি বয়সে মেয়ের বিয়ে হোক, তা মুরব্বিরাও চান না। রাস্তাঘাটে যৌন নির্যাতন বা বখাটেদের উৎপাতের কারণেও অভিভাবকেরা তড়িঘড়ি করে মেয়ের বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চান। দেশের কিশোরীদের প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশই অপুষ্টির শিকার। বিয়ের পরই স্বামী ও অন্যরা সন্তানের মুখ দেখতে চায়। এক বা দুই বছরের মধ্যে সন্তান পেটে না এলে স্বামী যদি বংশরক্ষার জন্য আবার বিয়ে করে ফেলে, সে জন্য মেয়ের বাড়ি থেকেও সন্তান নেওয়ার জন্য মেয়েটিকে চাপ দিতে থাকে। কিন্তু এই অপুষ্ট মা কম ওজনের সন্তানের জন্ম দেয়। নবজাতক মারা যায়। মারা না গেলেও মা ও সন্তানের অসুখ লেগেই থাকে। চিকিৎসার খরচ, পরিবারের লোকজনের কাজ কামাই দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি শুরু হয়। এতে নেতিবাচক অবস্থা চলতেই থাকে পরিবারটিতে।’

এ ধরনের উদাহরণ আছে খুবই কম: গত বছরের আগস্ট মাসে প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্ক কনেকে বিয়ে করার দায়ে বর খোরশেদ আলমকে (২৮) জেলহাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা তাঁর কার্যালয়ে আদালত বসিয়ে বরকে দুই মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।
এর আগে একই আদালতে অপ্রাপ্তবয়স্ক স্কুলছাত্রীকে বাল্যবিবাহ দেওয়ার দায়ে কনের বাবা আবু তাহের ও মা হোসনে আরা বেগমকে এক হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি সরকারি আদেশ অমান্য করার অপরাধে দণ্ডবিধি ১৮৮ ধারায় তাঁদের উভয়কে আরও এক হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সহযোগিতার দায়ে বরের বাবা কালা মিয়া ও ভাই জামাল হোসেনকে দুই হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে এক মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের আদেশের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা জরিমানার টাকা পরিশোধ করে সাজা ভোগ থেকে রেহাই পান।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, সেনবাগ উপজেলার ডমুরুয়া ইউনিয়নের বাবুপুর-শ্রীপুর গ্রামের কালা মিয়ার ছেলে প্রবাসী খোরশেদ আলমের (২৮) সঙ্গে গত ২৩ জুলাই একই ইউনিয়নের নলুয়া গ্রামের আবু তাহেরের মেয়ে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী তাজ নেহার বেগমের (১৩) বিয়ের দিন ঠিক হয়। খবর পেয়ে ইউএনও মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা চিঠি দিয়ে বিয়ে না দেওয়ার জন্য কনের বাবা-মাকে নির্দেশ দেন। কিন্তু সরকারি আদেশ অমান্য করে গত ২৯ জুলাই বরের বাড়িতে কনেকে নিয়ে গোপনে কাবিনবিহীন বিয়ে দেওয়া হয়।
গত বছরের মে মাসে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বিয়ে দিতে গিয়ে শ্রীঘরে যান ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার নাগারদিয়া গ্রামের এক মা। মেয়ের বয়স ১৮ বছর না হওয়ায় ইউএনও এস এম আবদুল কাদের গিয়ে বিয়ে বন্ধ করেন। ইউএনও ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাঁকে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেন। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
গত জুলাই মাসে নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের হস্তক্ষেপে বাল্যবিবাহ পণ্ড হয়ে গেছে। মেয়েটির বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে বিয়ে দেবেন না বলে তার বাবা মুচলেকা দিয়েছেন। উপজেলার খলিশাউড় গ্রামের ওই মেয়ের (১১) সঙ্গে উপজেলার বিশকাকুনী ইউনিয়নের জামাইকোনা গ্রামের একটি ছেলের (১৬) বিয়ে ঠিক হয়।
গত জুলাই মাসে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ওবায়দুল ইসলাম মুদিরগাঁও গ্রামে গিয়ে বাল্যবিবাহ বন্ধের নির্দেশ দেন। মেয়েটির বাবা মুচলেকা দেন, মেয়ের বয়স ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে দেবেন না।
মেয়ের জন্মনিবন্ধন সনদ অনুযায়ী, এই মেয়ের জন্ম ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি।
গত আগস্টে দিনাজপুর শহরের ঘাসিপাড়া মহল্লায় ১৪ বছর বয়সের আসিয়া খাতুনের সঙ্গে শহরের সুইহারী এলাকার মো. মোফাজ্জল হকের ছেলে আবদুস সালামের (২৭) বিয়ের অনুষ্ঠানে দিনাজপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবদুর রহমান পুলিশ নিয়ে হাজির হয়ে বিয়ে ভেঙে দেন। এ সময় বিয়ের কাজি আবদুর রশিদ ক্ষমা প্রার্থনা করলেও ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করেন। এ ছাড়া ছেলে ও মেয়ের অভিভাবকেরা সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিয়ে দেবেন না মর্মে মুচলেকা দেন।
গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রোগ্রাম ম্যানেজার তপন কুমার দাশ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়েদের শিক্ষায় বাল্য বিয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। শিক্ষার হার কম হলে বাল্য বিয়ের ঘটনা বেশি ঘটে, আবার বাল্য বিয়ের জন্যই মেয়েরা স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। হাওর, চর, পার্বত্য অঞ্চলে বাল্য বিয়ের ঘটনা বেশি ঘটছে। সরকারকে কিশোরীদের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেয়েদের জন্য কারিগরি শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে।’
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক-উল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে সরকার কাজ করছে, তবে আরও অনেক কিছু করার আছে বা করতে হবে।’ তিনি বলেন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রচার, প্রচারণা, প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। এ ছাড়া কোনো জায়গায় বাল্যবিবাহ হচ্ছে—খবর পেলেই তা প্রশাসনের মাধ্যমে বন্ধ করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে ফলাফল এখনো ততটা আশাব্যঞ্জক নয়। এ ছাড়া বেশির ভাগ বিয়েই হচ্ছে গোপনে বা সবার অগোচরে। অভিভাবকদের ধারণা, মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিলে আর কোনো দায়িত্ব নেই। এ ছাড়া ‘ভালো পাত্র’ পাওয়া গেলেও অভিভাবকেরা দেরি করতে চান না। কেননা, ভবিষ্যতে যদি আর বিয়ের জন্য এ ধরনের ছেলে না পাওয়া যায়!

সূত্র: দৈনিক প্রথম-আলো, নারীমঞ্চ ।
তারিখ: ২১-০৯-২০১১